যেসব প্রযুক্তির বিদায় ঘন্টা বেজেছে
২০২৫: যখন পরিচিত প্রযুক্তিগুলো নীরবে হারিয়ে গেল:
সময় বদলায়, বদলায় মানুষের অভ্যাস। আর সেই পরিবর্তনের স্রোতেই ২০২৫ সালে বিদায় নিয়েছে একাধিক পরিচিত প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা—যেগুলো একসময় আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল। অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়লেও এসব প্রযুক্তির চলে যাওয়া আবেগ ছুঁয়ে গেছে বহু ব্যবহারকারীর।
টিভো বক্স: রেকর্ডিংয়ের স্বাধীনতার শেষ অধ্যায়:
স্ট্রিমিং যুগের আগে টিভো ডিভিআর বক্স টিভি দেখার ধারণাই পাল্টে দিয়েছিল। পছন্দের অনুষ্ঠান রেকর্ড করে পরে দেখার সুবিধা তখন ছিল বিপ্লবী। তবে নেটফ্লিক্স–ইউটিউবের যুগে ডিভিআরের প্রয়োজন ফুরিয়ে আসে। দীর্ঘদিন টিকে থাকলেও ২০২৫ সালে টিভো বক্সের হার্ডওয়্যার যাত্রার অবসান ঘটে। যদিও ইউরোপে টিভো এখন সফটওয়্যারভিত্তিক সেবায় সীমিতভাবে সক্রিয়।
হিউম্যান এআই পিন: স্বপ্ন ছিল, বাস্তবতা হয়নি:
স্মার্টফোনের বিকল্প হিসেবে আলোচনায় এসেছিল স্ক্রিনবিহীন হিউম্যান এআই পিন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এই পরিধানযোগ্য ডিভাইস নিয়ে শুরুতে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু উচ্চমূল্য, অতিরিক্ত গরম হওয়া, ভুল তথ্য দেওয়া এবং দুর্বল প্রজেকশন প্রযুক্তি দ্রুতই হতাশ করে ব্যবহারকারীদের। ২০২৫ সালের শুরুতেই নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এর সাপোর্ট বন্ধ করে দেয়—আর এআই পিন পরিণত হয় ব্যর্থ উদ্ভাবনের প্রতীকে।
স্কাইপ: ইন্টারনেট কলের পথপ্রদর্শকের বিদায়:
আজকের ভিডিও মিটিং সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল স্কাইপ। একসময় বিদেশে ফোন করা যেখানে ব্যয়বহুল ছিল, সেখানে স্কাইপ বিনা খরচে ভয়েস ও ভিডিও কলের সুযোগ এনে দেয়। তবে মাইক্রোসফটের অধিগ্রহণের পর ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায় এটি। জুম ও গুগল মিটের দাপটে শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের মে মাসে স্কাইপকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর দেওয়া হয়।
পকেট: ‘পরে পড়ব’-এর জায়গা শূন্য:
অনলাইনে পড়ার তালিকা সাজিয়ে রাখার জন্য পকেট ছিল অগণিত পাঠকের ভরসা। ওয়েবের লেখা সংরক্ষণ করে পরে পড়ার এই জনপ্রিয় সেবাটি ২০০৭ সালে যাত্রা শুরু করে। মজিলার অধীনে থাকলেও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি এসে পকেট বন্ধ করে দেওয়া হয়—ডিজিটাল পাঠাভ্যাসে তৈরি হয় এক নীরব শূন্যতা।
মেটার ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের ইতি:
২০২৫ সালের শুরুতে বড় সিদ্ধান্ত নেয় মেটা। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে তৃতীয় পক্ষের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রোগ্রাম বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, আগের পদ্ধতি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে উঠেছিল। তার বদলে চালু হয় ‘কমিউনিটি নোটস’, যেখানে ব্যবহারকারীরাই তথ্য যাচাইয়ে অংশ নেন। এই পরিবর্তন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্ক তৈরি করে।
টিকটক ক্রিয়েটর মার্কেটপ্লেসের রূপান্তর:
টিকটক তাদের ক্রিয়েটর মার্কেটপ্লেস বন্ধ করে নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘টিকটক ওয়ান’ চালু করেছে। এখানে কনটেন্ট তৈরিতে জেনারেটিভ এআই-এর ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে, যুক্ত হয়েছে এআই অবতার দিয়ে বিজ্ঞাপন তৈরির সুবিধা। ফলে আগের পরিচিত মার্কেটপ্লেসটি কার্যত হারিয়ে যায়।
গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট ও ডার্ক ওয়েব রিপোর্ট:
গুগল ২০২৫ সালে একসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেবার ইতি টানে। সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক ডার্ক ওয়েব রিপোর্ট টুলটি মাত্র এক বছরেই বন্ধ হয়। পাশাপাশি ঘোষণা আসে—জনপ্রিয় গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট ২০২৬ সালের মধ্যে পুরোপুরি বিদায় নেবে। এর জায়গায় আসছে গুগলের নতুন এআই ব্যবস্থা ‘জেমিনি’। তবে বহু ব্যবহারকারী এখনো অ্যাসিস্ট্যান্টের বিকল্প হিসেবে জেমিনিকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেননি।
২০২৫ মনে করিয়ে দিয়েছে—প্রযুক্তিতে স্থায়িত্ব বলে কিছু নেই। আজ যা অপরিহার্য, কাল তা ইতিহাস। তবে এসব হারিয়ে যাওয়া প্রযুক্তি আমাদের ডিজিটাল জীবনের যে অধ্যায় তৈরি করেছে, তা সহজে ভুলে যাওয়ার নয়।
প্রতি /এডি /শাআ











